কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজশাহী কলেজ

3
128

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাজশাহী কলেজে এসেছিলেন। তিন দিন তিনি থেকেছেন রাজশাহী কলেজের ছাত্রদের সাথে। তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তরুণদের সত্যিকার অর্থে কত ভালোবাসতেন তার উল্লেখ পাওয়া যায় রাজশাহী কলেজের তৎকালীন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিন দিনের সফরে রাজশাহী আসেন। কবি কাজী নজরুল রাজশাহীতে এলেন বেলা এগারোটায়। তাঁকে গেতেম খাঁ মহল্লার আশরাফ আলী ব্যারিস্টারের বাড়ী ‘চৌধুরী দালান’ -এ এনে উঠানো হলো।

নাটোরের বিখ্যাত জমিদার ব্যারিস্টার আশরাফ আলী চৌধুরীর কাচারী ‘চৌধুরী দালান’ নামে পরিচিত। বিশাল অট্টালিকা, অট্টালিকা দুভাগে বিভক্ত। একদিকে কাচারী, অন্যদিকে মেস। রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রদের মেস করে থাকার জন্য জমিদার ব্যারিস্টার আশরাফ আলী চৌধুরী নির্ধারিত করে দেন। স্থানটি রাজশাহী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের উত্তর দিকে ২০০ গজ দূরে অবস্থিত। ব্যারিস্টার চৌধুরী ছাত্রদের বিনা ভাড়ায় থাকতে দিতেন। সাধারণত ২০ জনের মতো ছাত্রের বসবাসের ব্যবস্থা ছিলো। এরই একটি প্রশস্ত কামরা কবির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো।

কবিকে ‘চৌধুরী দালানে’ ছাত্রদের মেসে উঠানো হলে উদ্যেক্তাগণ একটু বিব্রত হলেন কিন্তু কবি বললেন যে, তিনি ছাত্র ও তরুণদের ভোলোবাসেন। সুতরাং তাদের সংগে বাস করতে তিনি পছন্দ করেন। তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আরো বলেছিলেন, ‘আমি দেরিতে ঘুমাই, তোমাদের অসুবিধা হবে না তো?’ তারা তক্ষুনি জবাব দিলো, ‘না, আমরা আপনার জন্য একটা বড় কামরাই ছেড়ে দিয়েছি।’ নজরুল সহাস্যে তাদের ব্যবস্থা অনুমোদন করলেন।

প্রিয়দর্শী কবি ‘চৌধুুরী দালানের’ অর্থাৎ মেসের বসবাসরত রাজশাহী কলেজের ছাত্রদের নিয়েও একটি গ্রুপ ফটো তোলেন। কবি যে ‘চৌধুরী দালানে’ অবস্থান করেছিলেন তারই সন্নিকটে ছিল একটি বৃহৎ বকুল গাছ। এই বকুল বৃক্ষ তলায় কবিকে নিয়ে ছাত্ররা ছবি উঠান। সময়টা ছিল ডিসেম্বরের কোন এক সকাল আটটা। অতি সাধারন কিন্তু অপূর্ব বেশ ছিলো কবির। সাদা ধূতি লুংগির মতো করে পরা, গায়ে পাঞ্জাবির উপর শাল এবং পায়ে নাগরাই জুতা।

Kazi Nazrul Islam at Rajshahi College

প্রথম দিনে রাজশাহী কলেজের লাগোয়া ফুলার হোষ্টেলে কলেজের মুসলমান ছাত্রগণ কবিকে মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করেন। রাজশাহী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ টি. টি. উইলিয়ামস ও অধ্যাপক শেখ শরফুদ্দিনও উক্ত ভোজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এখানে তিনি বক্তব্য দেন ও সংগীত পরিবেশন করেন।

কবি রাজশাহীতে এসে পৌঁছার সংগে সংগে সকল সম্প্রদায় এর মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিলো। প্রধানত রাজশাহী মুসলিম ক্লাব এর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে এবং সেই সংগে কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে সভা আহ্বান করা হয়েছিলো।

রাজশাহীতে সংবর্ধনার জবাবে কবির বক্তব্যে বলেন, “আপনারা আমাকে ভালবাসেন, আপনারা আমার বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী গুরুজন। আপনাদের হৃদয়ে আমার জন্য এতো ভালবাসা সঞ্চিত আছে তা দূর থেকে বুঝতে পারা কঠিন। আপনারা আমাকে ভালবাসার ফুল আর আনন্দের সওগাত দিয়ে অভিনন্দিত করলেন তা আমাকে অভিভূত করেছে। আমি যেন দেশ ও দশের জন্য ভাইবোনদের জন্য রসসমৃদ্ধ কাব্য লিখতে পারি, ভরে তুলতে পারি সবার প্রাণ মন আনন্দে প্রীতিতে।

এই সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন কবি শাহাদাৎ হোসেন ও কবি বন্দে আলী মিয়া। রাজশাহী সফরের তিন দিনই তিনি থেকেছেন রাজশাহী কলেজ সংলগ্ন চৌধুরী দালানে রাজশাহী কলেজেন শিক্ষার্থীদের সাথে।

কবি, পরের দিন অতি প্রত্যুষে নাটোর থেকে ট্রেন যোগে কলকাতা ফেরেন।

তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন: ঐতিহ্যে রাজশাহী কলেজ ‘স্মারকগ্রন্থ’; স্মৃতিময় নজরুল – আমার গ্রন্থাগার; খোরশেদ পাটোয়ারী; শুভ সাহা

3
Leave a Reply

avatar
3 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
2 Comment authors
md.borhan uddinমোঃ আহাদুজ্জামান আহাদMohammad amin Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Mohammad amin
Guest
Mohammad amin

Wonderful

মোঃ আহাদুজ্জামান আহাদ
Guest
মোঃ আহাদুজ্জামান আহাদ

কবির কথা গুলো সেয়ার করার জন্য রাজশাহী কলেজ বার্তার টিমকে অসংখ ধন্যবাদ।

md.borhan uddin
Guest
md.borhan uddin

শুনে খুব ভালো লাগলো যে তিনি এই শহরে পা রেখেছিলেন ।।