সংকটে থেকেও সেরা রাজশাহী কলেজ

0
174

দেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ। উত্তরাঞ্চলের প্রথম ও দেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ এটি। মাত্র ছয়জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা করা এ বিদ্যাপীঠে সময় পরিক্রমায় শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বেড়েছে বহুগুণ।

কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত অবকাঠামো। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পাশাপাশি সৃষ্টি হয়নি শিক্ষকের নতুন পদ। তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নান্দনিক ভবন, গুণগত পাঠদান আর ভালো ফলের জন্য দেশসেরা কলেজের খেতাব অর্জন করেছে শতবর্ষী রাজশাহী কলেজ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন হোস্টেল নির্মাণ না করায় কলেজের আবাসন সংকট দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন সুবিধার আওতায় রয়েছেন মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি শিক্ষার্থীদের অনেকে মেসে থাকেন, কেউবা বাড়ি থেকে কলেজে আসা-যাওয়া করেন। বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা।

কলেজের নিজস্ব বাস রয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে ভাড়ায় চালিত ১৫টি বাস দিয়ে পরিবহন সেবা চলছে। অর্থাভাবে নির্মাণ করা যাচ্ছে না নতুন একাডেমিক ভবন; রয়েছে গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সংকটও।তবে নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগ আর শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কলেজটির শিক্ষার মান বেশ ভালো। ধারাবাহিকভাবে ঈর্ষণীয় ফল করছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা। পর পর দুবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কলেজের খেতাব মিলেছে। পরিবেশবান্ধব ও শিক্ষাবান্ধব এ কলেজটি এখন দেশের একমাত্র মডেল কলেজ।

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মহা. হবিবুর রহমান বলেন, কলেজে আবাসন সংকট, পরিবহন সংকট ও একাডেমিক ভবন সংকট রয়েছে। তবে সে সংকট পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে রাজশাহী কলেজ। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদানে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন কর্মরত শিক্ষকরা।

সংকট নিরসনে গৃহীত পরিকল্পনা বিষয়ে অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে দশতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং জরাজীর্ণ ভবনগুলো সংস্কার করে আবাসন সংকট মেটানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া পরিবহন সেবার মানোন্নয়নে নতুন বাস অনুদান হিসেবে আনতে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ চলছে।

জানা যায়, ১৮৭৩ সালে প্রাচীন বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল ও কলেজিয়েট স্কুলের হাত ধরেই আজকের রাজশাহী কলেজের যাত্রা। ১৮৭৮ সালে কলেজটির প্রথম গ্রেড মর্যাদা লাভ। ‘রাজশাহী কলেজ’ নামকরণ হয় ওই সময়ই। উত্তরবঙ্গের প্রথম কলেজ হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পর এতে চালু হয় বিএ কোর্স। এর পর ১৮৮১ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৮৮৩ সালে যোগ হয় বিএল কোর্স।

যদিও ১৯০৯ সালে মাস্টার্স কোর্স ও বিএল কোর্সের অধিভুক্তি বাতিল করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় এ প্রতিষ্ঠান। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স ও সম্মান ডিগ্রি প্রদান করছে রাজশাহী কলেজ; চালু রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পাঠক্রমও।

বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি রাজশাহী কলেজে ২৪টি বিভাগে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও স্নাতক (পাস) কোর্স চালু রয়েছে। এসব বিভাগে অধ্যয়নরত প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কলেজটিতে ২৪৯ পদের বিপরীতে পাঁচজন সংযুক্তসহ শিক্ষক রয়েছেন ২৩৫ জন।

শিক্ষার মানোন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের শতভাগ ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করে ‘ডিজিটাল অ্যালার্ট সিস্টেম’। ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতিসহ অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য রয়েছে পুরস্কারের ব্যবস্থা। ক্লাসের বাইরে সহপাঠ্যক্রমেও এগিয়ে রাজশাহী কলেজ। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ২৫টি সংগঠন।

শিক্ষার্থীদের পরিচালিত এসব সংগঠন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এর মধ্যে রয়েছে— রাজশাহী কলেজ নাট্য সংসদ, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি, রোভার স্কাউট, বরেন্দ্র থিয়েটার ও রাজশাহী কলেজ সংগীতচর্চা কেন্দ্র।

দেশের প্রথম ডিজিটাল কলেজও রাজশাহী কলেজ। শ্রেণীকক্ষগুলোয় স্থাপন করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া সুবিধা। এছাড়া শ্রেণীকক্ষের বাইরেও রয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে চালু করা হয়েছে বিনামূল্যের তারবিহীন ওয়াইফাই ইন্টারনেট সুবিধা। এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে দেশে এখানেই প্রথম সন্ধ্যাকালীন গ্রন্থাগার সেবা চালু হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাসের জন্য বেশ সুনাম রয়েছে রাজশাহী কলেজের। কলেজজুড়ে জিরো সয়েল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কর্তৃপক্ষ। ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। বাকিটুকু মুড়ে দিচ্ছে ইট-পাথরে। এক কথায় কলেজ ক্যাম্পাসজুড়েই সবুজের ছোঁয়া।

কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী বাবর আলী বলেন, ক্লাসের একঘেয়েমি কাটাতে আগে বন্ধুদের সঙ্গে পাশে পদ্মার তীরে যেতাম। এখন আর যাই না। ক্লাসরুম থেকে বের হলেই ফুলের বাগান। স্নিগ্ধ ক্যাম্পাস। নির্মল বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিই। এতে ফিরে পাই প্রাণশক্তি।

কলেজের প্রাচীন ভবনগুলো এনে দিয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। কলেজের ঐতিহাসিক ভবনের কথা উঠতেই চলে আসে প্রশাসনিক ভবনের নাম। ১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয় এ ভবন। এটি ব্রিটিশ-ভারতীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতল এ ভবন।

এ ভবনটির চূড়ায় এক সময় ছিল রোমান পুরাণের জ্ঞান ও চারুশিল্পের দেবী এথেনার ভাস্কর্য। পরে একই আদলে আরো দুটো ভাস্কর্য হেমন্ত কুমারী ছাত্রাবাসে স্থাপিত হয়। এ চারটি ভাস্কর্যই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকবাহিনীর দোসরদের চাপে অপসারিত হয়। প্রশাসনিক ভবনের পেছনে পুকুরের পশ্চিমপাড়ে প্রশাসন ভবনের আদলেই গড়া আরেক ঐতিহাসিক ‘হাজী মুহাম্মদ মহসিন’ ভবন ১৮৮৮ সালে নির্মিত হয়। কলেজ ক্যাম্পাসেই রয়েছে আরেক ঐতিহাসিক ‘ফুলার ভবন’।

এ ভবনটিও শত বছর পেরিয়েছে। কলেজ মাঠের একেবারে দক্ষিণে অধ্যক্ষের দোতলা বাসভবন। এ ভবনটিতে উপমহাদেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদরা বসবাস করে গেছেন। এটিও নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীতে। এ ভবনের দক্ষিণ পাশে বয়ে গেছে এককালের খরস্রোতা পদ্মা। এর পশ্চিমে রয়েছে হযরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার। কলেজের ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাসের ভবনগুলোও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

নান্দনিক পরিবেশ বিষয়ে কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. নাজনীন সুলতানা বলেন, রাজশাহী কলেজের নান্দনিকতা শিক্ষার্থীদের মনের ওপর প্রভাব ফেলছে। আনন্দের সঙ্গে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। শুধু শিক্ষার্থীই নন, বাইরের দর্শনার্থীরাও ঘুরতে আসছেন এখানে। রাজশাহীর অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এটি।

বিএ-০১/০৮-০৭ ( শিক্ষা ডেস্ক: সূত্র,বণিক বার্তা)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of