স্মৃতিচারণ ও আনন্দ-উল্লাসে রাজশাহী কলেজ এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনীর সমাপ্তি

0
34

স্মৃতিচারণ ও আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে শেষ হলো রাজশাহী কলেজের প্রথম এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শনিবার দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

এতে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৯ হাজার অ্যালামনাস। দীর্ঘদিন পরে ক্যাম্পাসে এসে কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা উৎসবে মেতে ওঠেন। পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের কাছে পেয়ে উ”ছ¡সিত হন তারা। শোনালেন হাজারো স্মৃতির গল্প। নাচ, গান, আনন্দ-উল্লাস আর আবেগঘণ মূহুর্তগুলোকে ফ্রেমে বন্দি করে রাখলেন। নিজেরা রোমাঞ্চিত হলেন, সেই সঙ্গে আবারো একবার গর্বিত করলেন কালের সাক্ষী ঐহিত্যবাহী রাজশাহী কলেজকে।

শনিবার সকাল থেকে দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রমে অংশ নিতে ক্যাম্পাসে ঢুকতে থাকেন অ্যালামনাসরা। নানা সাজে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন তারা। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে সকাল থেকে বৃক্ষরোপণ, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, ব্যাচভিত্তিক স্মৃতিচারণ, রাজশাহী কলেজের উন্নয়নের অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের আগামীর স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা ইত্যাদিতে অংশ নেন তারা।

তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে রাজশাহী কলেজের অতীত ঐতিহ্য-ইতিহাস, রূপালী অতীতের সোনালী গল্প। তাদের গল্পে উপ¯ি’তরা হারিয়ে যান সেই দিনগুলোতে। গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সিনিয়র অ্যালামনাসরা যেমন যৌবনের সেই তারুণ্য ফিরে পেয়েছিলেন, তেমনিভাবে সকলকে করেছেন গৌরবান্বিত। সিনিয়রদের মুখে রাজশাহী কলেজের গৌরবগাঁথা শুনে গর্বে বুক ফুলিয়েছেন তরুণরা।

এগুলোর মাঝে চলতে থাকে একক, গ্রুপভিত্তিক ছবি ও সেল্ফি তোলা। ব্যাচের বন্ধুদের সাথে আলাপ, কলেজে কাটানো সময়ের স্মৃতি রোমš’ন, বন্ধুদের ফোঁড়ন কাটা, হাসি-ঠাট্টা, হাজারো খুনসুটি। অনেকেই পুরোনো দিনের বন্ধুকে কাছে পেয়ে স্মৃতি রোমš’ন করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ফিরে গেছেন সেই পুরোনো দিনগুলোতে।

এদিকে, টানা চারবার শিক্ষামন্ত্রনালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম হওয়া কলেজের বর্তমান সৌন্দর্যে অভিভূত প্রাক্তনরা। বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজের এমন আমূল পরিবর্তে তারা মুগ্ধ, সেইসঙ্গে গর্বিত। রাজশাহী কলেজকে অনন্য উ”চতায় নিয়ে যাওয়া এবং এই অ্যালামনাই অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় তারা বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানের শেষ দিন মধ্যাহ্ন বিরতির পরে রাজশাহী কলেজ এইচএসসি অ্যালামনাই গঠন, র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও সন্ধ্যায় অনুুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় ব্যান্ড দল ‘চিরকুট’।

এরপরেই ছিল চোখ ধাঁধানো আতসবাজির খেলা। লাল, নীল, সবুজ, হলুদসহ নানারকম আলোর ঝলকানিতে জ্বলে ওঠে রাজশাহী কলেজের আকাশ। কলেজ মাঠে থাকা হাজার হাজার অ্যালামনাস তা উপভোগ করেন। তাদের তালি ও সিটিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠান¯’ল। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটে দুই দিনব্যাপী এই মহা মিলনমেলার।

এর আগে, অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিন শুক্রবার সকালে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। এতে অংশ নেন অ্যালামনাই পুনর্মিলনীর আহ্বায়ক ও কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, নাটোর-৪ আসনের এমপি আব্দুল কুদ্দুস, রাজশাহী-৩ আসনের এমপি আয়েন উদ্দিন, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি আদিবা আনজুম মিতা, সিনিয়র অ্যালামনাস ব্যাচ ১৯৪৭-এর ডা. এসএএ বারীসহ রেজিস্ট্রেশনকারী ১০ হাজার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

এরপরে প্রধান অতিথি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে অ্যালামনাই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এসময় কলেজ অধ্যক্ষ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, অন্যান্য মন্ত্রী-এমপি ও অতিথিদের উপ¯ি’তিতে কেক কাটেন প্রধান অতিথি।

১৯৫৮ সালে রাজশাহী কলেজের উ”চ মাধ্যমিকের (এইচএসসি) শিক্ষার্থী ছিলেন শহিদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনিও যোগ দিয়েছেন মিলন মেলায়। তার মতে, এমন অপরূপ সাজে তিনি এই কলেজকে আগে কখনও দেখেন নি। এছাড়াও কলেজের বর্তমান সৌন্দর্যে মুগ্ধ তিনি। তিনি কলেজের সৌন্দর্য সম্পর্কে বলেন, ‘আল্ট্রা মডার্ণ, অতি সুন্দর’। ছেলে ও পুত্রবধুর সঙ্গে এই মিলনমেলায় অংশ নিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শেষ করা এই অ্যালামনাস।

ইংরেজ প্রকৌশলীর পরিকল্পনায় নির্মিত পুরনো গাঢ় লাল রঙের ভবনগুলো এমনিতেই কলেজের বিশেষ আকর্ষণ। সেসব ভবনের ওপর করা হয়েছে সাদা রঙের আলোকসজ্জা। এই আলোকসজ্জা ভবনগুলোর সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। শুধু প্রশাসন ভবন নয়, কলেজের অন্যান্য সব ভবনে করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা। বাদ যায়নি কলেজের ভেতরে থাকা গাছগুলোও।

অ্যালামনাই উপলক্ষে রাজশাহী কলেজ মিলনায়তনের সামনের জায়গাটিতে নতুন করে দৃষ্টিনন্দন টাইলস বসানো হয়েছে। তার পাশে করা হয়েছে গাঁদা ফুলের বাগান। প্রশাসন ভবনের আদলে মাঠে তৈরি করা হয়েছে বিশালাকার অ্যালামনাই অনুষ্ঠানের মঞ্চ।

কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রখ্যাত কবি, গীতিকার এবং সুরকার রজনীকান্ত সেনের নামে মঞ্চের নাম দেয়া হয়েছে ‘রজনীকান্ত মঞ্চ’। শুক্রবার সন্ধ্যায় এই মঞ্চে গান গেয়ে দর্শকদের মন মাতান জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমস।

শুক্রবার সকাল থেকে মূল অনুষ্ঠান শুরু হলেও বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিকালের পর থেকেই কলেজে আসতে শুরু করেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ¯’ান থেকে আসা সাবেক শিক্ষার্থীরা। কেউ যান স্ত্রীকে নিয়ে, কেউ স্বামীকে, কেউ সন্তান এবং কেউ নাতি-নাতনিদের নিয়ে। কলেজে গিয়ে আনন্দ আড্ডায় মেতে ওঠেন কলেজ জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে।

প্রসঙ্গত, রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রমত্তা পদ্মার পাশ ঘেঁষে অব¯ি’ত কলেজটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম কলেজের পরে বাংলাদেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ। ১৮৭৩ সালের পহেলা এপ্রিলে মাত্র ৬ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে কলেজটি। বর্তমানে প্রায় সাতাশ হাজার শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ ও দেশের শিক্ষাঙ্গনে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে প্রাচীন এই বিদ্যাপিঠ।

১৪৭ বছরের দীর্ঘ পথ চলায় বিভিন্ন চড়াই উৎরায় পার হয়ে কলেজটি এখনও স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। গতিশীল সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাজশাহী কলেজ নিজেকে রাঙ্গিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষামন্ত্রনালয়ের অধীনে পৃথকভাবে চারবার দেশসেরার মুকুট অর্জন করেছে। এছাড়াও পেয়েছে ডিজিটাল কলেজের খেতাব।

প্রায় সাতাশ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর ক্যাম্পাসটিতে ২৪ টি বিভাগে স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর, ডিগ্রি ও এইচ.এস.সি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করা হয়। বর্তমানে কলেজে ২৬০ জন কর্মঠ শিক্ষক কর্মরত আছেন।

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পিছিয়ে নেই রাজশাহী কলেজ। কলেজের নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ¯’াপন করা হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। প্রতিটি বিভাগে চালু করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম।

শিক্ষকদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় ল্যাপটপ। প্রতিটি বিভাগে রয়েছে সুদৃশ্য কম্পিউটার ল্যাব। ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বহির্বিশ্বের সাথে সর্বদা যোগাযোগ রাখার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা। রয়েছে শেখ রাসেল ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of