দুটি সফলতা, আর একজন সফল নায়ক!

রাজশাহী কলেজ বার্তা | | July 21, 2018 at 8:51 pm

এম ওবাইদুল্লাহ: একজন সফল নায়ক। একজন সফল শিক্ষক। সফল অধ্যক্ষ, সফল পিতা। একজন সফল উৎসাহ-প্রেরণাদায়ক বক্তাও তিনি। বলছিলাম সেই মানুষটির কথা, যার উৎসাহ ও প্রেরণাদায়ক বক্তৃতার অবদানে অনেক শিক্ষার্থী জীবনে বিভিন্ন বাধা ডিঙিয়ে গেছেন। খুঁজে পেয়েছেন সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহনের সিড়ি।

বলছিলাম সেই মানুষটির কথা, যার অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা মননের সুষ্ঠু ব্যবহারের ফলে আজকে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী পেয়েছে সুন্দর, মনোরম, পড়ালেখার পরিবেশ উপযোগী ধুমপান মুক্ত ক্যাম্পাস। যে মানুষটির সুযোগ্য নেতৃত্বে রাজশাহী কলেজ আজ শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যে, মননে-সৃজনে, বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে পরপর তিন বার দেশ সেরা কলেজ নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্রিকের সাফল্য অর্জন করেছে। হ্যাঁ, তিনি আর কেও নন, তিনি হলেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান স্যার।

তাঁর একটি কথা এখনও আমার কানে বাজে। একটি সমস্যা সমাধানে তিনি বলেছিলেন, “ভাল কাজ করলে বাধা আসবেই, তাই বলে কি ভাল কাজ করা বাদ দিয়ে দিবে?” এই ছোট্ট বাক্যটিই আমার জীবনের একটি পরম পাথেয় হয়ে থাকবে।

তিনি অনেক গুনের অধিকারী। তার মধ্যে একটি বড় গুন হচ্চে তাঁর মহানুভবতা। আজ আপনাদেরকে তাঁর মহানুভবতার একটি দৃষ্টান্ত দেখাবো। রাজশাহী কলেজের দু’জন শিক্ষার্থীর কথা বলবো যারা তাদের জীবনে হাজারো বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আজ সফল হতে চলেছে। তারা দু’জন হলেন অরণী কর্মকার ও ফারুক। তারা ২০১৮ সালে এইচএসসি পরিক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। আর তাদের এই সফলতার পিছনে যার সবেচেয়ে বেশি অবদান তিনি হলেন প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান স্যার।

কয়েকদিন আগে প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান স্যার তার ফেসবুকে ঐ দু’জন শিক্ষার্থীর পড়ালেখার প্রতি অদম্য ইচ্ছা, তাদের বিভিন্ন বাধা-প্রতিবন্ধকতা ও তাদের সফলতার কথা তুলে ধরেছেন। পাঠকদের জন্য তা হবহু তুলে ধরা হল……..

“ছাত্রীটির নাম অরণী কর্মকার। সে এবার এইচ এস সি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে।বুক ভরা আশা নিয়ে অরণী ও ফারুক নামে আরেকজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় রাজশাহী কলেজে। ফারুক নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হয়। ভর্তি প্রক্রিয়ার ৩য় দিনে আমি বিকেল ৫টার সময় অফিস হতে নিচে নামতে দেখি সিঁড়ির কাছে একটি অতি সাধারন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে সামান্য একটি স্যান্ডেল এবং হাফ হাতা জামা ওপরনের প্যান্টটি ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। কৌতুহলবশতঃ তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো? জানায়, সে নিউ গভঃ ডিগী কলেজে ভর্তি হয়েছে কিন্ত তার মা ও নানির প্রত্যাশা এবং তার আশা রাজশাহী কলেজে পড়ার। অপেক্ষমান তালিকায় তার অবস্থান ছিল সম্ভবত ৩১।

বললাম, তুমি হয়তো এ কলেজে চান্স পেতে পার, তবে কালকে সঠিক অবস্থা বুঝা যাবে। ভর্তির আশা নিয়ে সে জানালো, স্যার আমাকে ঐ কলেজ টাকা ফেরৎ দিবে না। ভর্তির টাকা আমার নানি ছাগল বিক্রি করে দিয়েছে। বললাম, তোমার বাবা কি করেন? সে জানায়, বাবা মাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেছে এবং আমার মা প্যারালাইজড।

এবার আমি পরিচয় দিয়ে বললাম আমি এ কলেজের অধ্যক্ষ, তুমি যদি আগামীকাল ভর্তির চান্স পাও তাহলে শুধু তোমার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপটি নিয়ে আসো এবং তোমাকে কোনো ভর্তি ফি ছাড়া ভর্তি করা হবে। দেখছি, ছেলেটির চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু ঝরছে। এই ছেলে তুমি এমন করছো কেন বলতেই সে তার পরিবারের করুন কাহিনী সবিস্তারে বলতে শুরু করলো। ভর্তি হল ফারুক। সকল অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ফারুক ও যার কথা এখনও বলা হয়নি সে অরণীকে রাখতাম বক্তা হিসেবে কারণ অদম্য ইচ্ছার যে জয় হয় তা অন্য শিক্ষার্থীদের জানানোর জন্য। ফারুক ও অরণী হয়ে যায় সবার চেনা ও হয়ে যায় সুবক্তা।

অরণী যখন নাটোরের এক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন থেকে সে বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে অর্জিত আয় দিয়ে তার পড়ালেখাসহ পরিবারকে সাহার্য করত। অরণী ও ফারুক খ শাখার শিক্ষার্থী। খ শাখার প্রথম ক্লাসে সকল শিক্ষার্থীর পরিচিতি জানার পর আমি বললাম, তোমরা কেউ স্বচ্ছল, কেউ অপেক্ষকৃত অস্বচ্ছল আবার কেউ একেবারে নিঃস্ব পরিবার হতে এসেছো। যদি কারও পরিবার একেবারেই সহায়সম্বলহীন হয় এবং পড়ালেখার খরচ চালাতে সক্ষম নয় সেক্ষেত্রে তোমরা নিঃসংঙ্কোচে আমার সাথে দেখা করবে। বাক্য শেষ না হতেই অরণী তার জীবন এবং পরিবারের অসচ্ছলতার কথা অশ্রভেজা চোখে বলা শুরু করল।

চোঁখ মুছে আর তার সপ্নের কথা ব্যক্ত করে। অপ্রস্তুত আমি এ কারণে যে, আমি চাইনি কেউ নিজেকে এভাবে উপস্হাপিত করুক। পরক্ষণে ভাবলাম আমি সঠিক নই বরং অরণীই সঠিক। ফারুক ও অরণীর মত অনেক শিক্ষার্থী ছিল যাদের কে আর্থিকভাবে যথেষ্ট সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অরণী ও ফারুককে রাজশাহী কলেজ ব্যাচ ৮৫ দুই জনকে ৩০০০টাকা করে রুহুল কবির স্মৃতি বৃত্তির ব্যবস্হা করে। রুহুল কবির ঐ ব্যাচে রাজশাহী বোর্ডে স্ট্যান্ড করে।ভর্তি হয় বুয়েটে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই মেধাবী ছাত্র ডুবে মারা যায়।তার স্মৃতিকে অম্লান করতে ৮৫ ব্যাচ চালু করে উক্ত বৃত্তি।

নাতিদীর্ঘ লেখার উদ্দেশ্য সহজ, কত মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে কষ্ট করে পড়ালেখা চালাচ্ছে বা অনেকে চালাতে সক্ষম হচ্ছেনা। একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট খাতকে সৎ বিবেচনা মোতাবেক ব্যবহার করলে এরূপ অনেক শিক্ষার্থীকে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

স্যারের ফেসবুকের এই পোস্টে কলেজের শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী, সাংবাদিক সহ অনেকেই কমেন্ট ও শেয়ার করে তাদের অনুভূতি জানিয়েছেন।কলেজের শিক্ষক নিতাই কুমার সাহা লিখেছেন, “স্যার, আপনার বিচক্ষণতা, মহানুভবতা, সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক নেতৃত্বের সমন্বয়। অরণি এবং ফারুককে আপনি যেভাবে সহযোগিতা করেছেন আমি তার নীরব সাক্ষী।”

শাওনেওয়াজ সরকার নামের একজন লিখেছেন, “You done a great job, Your organizational contribution is remarkable, request to all follow it.All good and favorable contribution for living things. Thanks a lot for the update.”

সাংবাদিক জিয়াউল গনী সেলিম লিখেছেন, “আপনার এই মহৎ উদ্যোগ সফলতা ছুঁয়েছে…”

কলেজের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান রাজু পোস্টটি শেয়ার করে ক্যাপশান দিয়েছেন, “২ টি চমৎকার সফলতার গল্প, এবং একজন সফল নায়ক।”

বিথিকা বানিক নামের একজন লিখেছেন “আমার বিশ্বাস, আপনার কলেজবাগানের প্রতিটি ফুল আপনার পরিচর্যায় সুবিকশিত হয়ে সুগন্ধ ছড়াবে। পরম করুণাময় সৃস্টিকর্তা আপনাকে সুস্থ, সুন্দর, সুখী ও দীর্ঘজীবন দান করুন।”

কলেজের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান নূর লিখেছেন, “স্যার, আপনার ছাত্র হতে পেরে আমরা গর্বিত।”

রিজভী হক সুজন লিখেছেন, “শিক্ষক মানে কি শুধুই জ্ঞানী জ্ঞানী চেহারার, অনেক অনেক ডিগ্রীধারী, গম্ভীর মুখে হেটে চলা একজন মানুষ? না বরং শিক্ষক হওয়ার অন্যতম প্রধান শত’ হৃদয়বাণ হওয়া! স্যার আপনার মাঝে এসবি বিদ্যমান। অভিনন্দন স্যার!”

Leave a Reply

Be the First to Comment!

avatar
  Subscribe  
Notify of