আমাদের সম্পর্কে

রাজশাহী কলেজ বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি রাজশাহী শহরে অবস্থিত।

১৮৭৩ সালে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজ এর পরে রাজশাহী কলেজ বাংলাদেশের ৩য় প্রাচীনতম কলেজ। বাংলাদেশে এই কলেজ হতেই সর্বপ্রথম মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করা শুরু হয়। কলেজটি রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে কলেজ রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এর পাশে অবস্থিত। এই প্রাচীন কলেজের পাশে অবস্থিত হবার কারণে স্কুলটির নাম কলেজিয়েট রাখা হয়েছিলো । এটি বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স ও সম্মান ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। ১৯৯৬ সাল থেকে এই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র নথিভুক্ত করা বন্ধ করা হলেও বর্তমানে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনরায় ভর্তি করা হচ্ছে।

ইতিহাস ও পটভূমি

শিক্ষানগরী হিসেবে রাজশাহী মহানগরীর গোড়াপত্তন হয় ১৮২৮ সালে বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। মূলত ইংরেজি শিক্ষার প্রতিস্থাপনা ও প্রসারকল্পে সে সময় রাজশাহীতে কর্মরত ইংরেজ কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল। সেদিনের সে ক্ষুদ্র ‘বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল’ ১৮৩৬ সালে প্রাদেশিক সরকার জাতীয়করণ করলে এ স্কুলটি রাজশাহী জিলা (বা জেলা) স্কুল নামে পরিচিত (এই বিদ্যালয় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল হিসাবে এখন পরিচিত)। সে স্কুলের ছাত্রদের উচ্চতর শিক্ষার জন্য একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় রাজশাহী অঞ্চলের অধিকাংশ বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৮৭৩ সালে জেলা স্কুলকে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের মর্যাদা দেয়া হয় এবং একই বছর ৫ জন হিন্দু ও ১ জন মুসলমান ছাত্রসহ মাত্র ছয় জন ছাত্র নিয়ে কলেজিয়েট স্কুলের সঙ্গে চালু হয় উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর সমমানের এফ. এ (ফার্স্ট আর্টস) কোর্স। ১৮৭৮ সালে এই কলেজকে প্রথম গ্রেড মর্যাদা দেয়া এবং “রাজশাহী কলেজ” নামে নামকরণ করার সাথে সাথে একে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত করে এখানে বি.এ. কোর্স চালু করা হলে উত্তরবঙ্গের সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজ। ১৮৮১ সালে এই কলেজে স্নাতকোত্তর শ্রেণীর উদ্বোধন করা হয় এবং ১৮৮৩ সালে যোগ হয় বি.এল কোর্স। ১৯০৯ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন আইনে কলেজ তার চাহিদা মেটাতে না পারলে মাস্টার্স কোর্স ও বি.এল. কোর্সের অধিভুক্তি বাতিল করা হয়।

রাজশাহী শহরে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ভূস্বামী রাজা, জমিদার এবং বিত্তশালীদের ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে দুবলাহাটির জমিদার হরনাথ রায় চৌধুরী, দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়, রাজা প্রমোদ রায় ও বসন্ত রায়; পুঠিয়ার রাণী শরৎসুন্দরী দেবী ও হেমন্ত কুমারী দেবী; বলিহারীর কুমার শরবিন্দু রায়; খান বাহাদুর এমাদ উদ্দীন আহমেদ, কিমিয়া-ই-সাদাত এর অনুবাদক মীর্জা মোঃ ইউসুফ আলী, হাজী লাল মোহাম্মদ, নাটোরের জমিদার পরিবারের খান বাহাদুর রশীদ খান চৌধুরী, খান বাহাদুর এরশাদ আল খান চৌধুরী ও বঙ্গীয় আইন পরিষদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার আশরাফ আলী খান চৌধুরী ছিলেন অগ্রগণ্য। এছাড়া নাটোরের খান চৌধুরী জমিদার পরিবার রাজশাহী শহরের হেতেম খাঁ এলাকার তাঁদের পারিবারিক বাসস্থান চৌধুরী লজ রাজশাহী কলেজে অধ্যয়নরত প্রায় বিশ জন গরীব মুসলমান ছাত্রের জন্য বিনা ভাড়ায় থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তদানীন্তন পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজের শিক্ষার উন্নয়নে তাদের এই ভূমিকা ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজশাহী কলেজ

কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন হরগোবিন্দ সেন, যিনি রাজশাহী জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি পাঁচ বছর (১৮৭৩-১৮৭৮) এই কলেজের অধ্যক্ষ্যের দায়িত্বে ছিলেন। ১৮৭৫ সালে প্রথম ব্যাচের এফ.এ পরীক্ষায় উপস্থিত ছাত্রদের মধ্যে মাত্র দুইজন পাশ করে। সরকার কলেজটি উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু রাজশাহী এসোসিয়েশন এর শক্ত প্রচেষ্টায় এই কলেজকে আপগ্রেড করে বি.এ. কোর্স প্রবর্তনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। রাজশাহী এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায় বাহাদুর রাজশাহী কলেজে ডিগ্রি কোর্স প্রবর্তনের জন্য রাজশাহী এসোসিয়েশন এর মাধ্যমে সরকারকে ১৫০,০০০ টাকা দেন। কলেজ অক্টোবর ১৮৭৭ সালে ডিগ্রী প্রোগ্রামের অনুমোদন পায় এবং ১৮৭৮ সালে বি.এ. কোর্স চালু হয়। এফ. টি. ডাওডিং ১৮৭৯ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।

১৯০৪ সালে ফী ছাড়া সংস্কৃত বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য রাজশাহী কলেজ প্রশাসনের অধীনে মহারাণী হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বলিহারের কুমার শরদিন্দ্বু রায় এর আর্থিক সহায়তায় ১৯১০ সালে রাজা কৃষ্ণেন্দু হল নির্মিত হয়। ১৯১৫ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ৫৭,১৪৫ টাকা ব্যয়ে পদার্থবিজ্ঞান ভবন নির্মান করে। রাজশাহী এসোসিয়েশনের উদ্যোগ এবং অধ্যক্ষ কুমুদিনীকান্ত ব্যানার্জির প্রচেষ্টায় মোট ৬টি হোস্টেল নির্মিত হয়ঃ ১৯২২ সালে ৩,৫৩,৮৬৩ টাকা ব্যয়ে ৫টি এবং ১৯২৩ সালে ৭৮,০০০ টাকা ব্যয়ে ১টি দ্বিতল ছাত্রাবাস ভবন নির্মিত হয়। ১৯২৫-২৬ সেশনে ৮৬,৮০৯ টাকা খরচে আর্টস বিল্ডিং এবং ১৯২৭ সালে কলেজের দক্ষিণ পার্শ্বে পদ্মা নদীর ধারে অধ্যক্ষের জন্য বাসভবন নির্মান করা হয়। এভাবে ধীরে ধীরে প্রায় ৩৫ একর জায়গার উপর অন্যান্য ভবন নির্মিত হয়।

১৮৮৪ সালে রাজশাহী কলেজ চত্বরে মাদ্রাসা ভবন নির্মিত হয়। ১৯৩০ সালে মাদ্রাসা অন্যত্র স্থানান্তরিত হলে ঐ বছরই ১৯০৯ সালে নির্মিত ফুলার ছাত্রাবাসটি কলেজকে হস্তান্তর করা হয়। দিঘাপতিয়ার রাজা বসন্তকুমার রায়ের আর্থিক সহায়তায় রাজশাহী কলেজ প্রশাসনের অধীনে ১৯৩৬ সালে এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ভবনটি কলেজের একটি ছাত্রাবাসে পরিণত হয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধিভুক্ত হয়ে কলেজে ১৮৮১ সালে এমএ কোর্স এবং ১৮৮৩ সালে থেকে স্নাতক ল কোর্স চালু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই রাজশাহী কলেজ থেকে আটজন ছাত্র এম.এ. এবং ষাটজন ছাত্র বি.এল. ডিগ্রী অর্জন করে। কিন্তু কলেজ এম.এ. এবং বি.এল. কোর্সর জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৯ সাল থেকে এম.এ. ও বি.এল. কোর্স স্থগিত রাখে। পূর্ব পাকিস্তানে রাজশাহী কলেজ প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধিভুক্ত হয় এবং পরে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হয়। এই কলেজে আই.কম., বি.কম. (পাস) এবং বি.কম. (সম্মান) কোর্স যথাক্রমে ১৯৫২, ১৯৫৪ এবং ১৯৬১ সালে চালু হয়। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হলে এর অধীনে এই কলেজে ১৯৯৪ সালে মাস্টার স্তরের কোর্স পুনরায় চালু হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কোর্স বন্ধ থাকলেও এই অঞ্চলের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে রাজশাহী কলেজে ২২টি বিষয়ে সম্মান কোর্স এবং ২১টি বিষয়ে মাস্টার কোর্স চালু রয়েছে। কলেজের ২৪৯ শিক্ষকের মধ্যে ৫৬ নারী শিক্ষক রয়েছেন।

তথ্য: উইকিপিডিয়া