রাজশাহী কলেজ সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে গড়ে উঠবে : শিক্ষামন্ত্রী

0
84

রাজশাহী কলেজসহ দেশের ১৩টি শতবর্ষী কলেজ ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী কলেজের প্রথম এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। আমি কদিন আগেই, এই রাজশাহী কলেজে এসে বাংলাদেশের ১৩টি শতবর্ষী কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছি। আমাদের দেশে যে ১৩টি শতবর্ষী কলেজ রয়েছে, সবগুলিই সুনামধন্য কলেজ, সেই কলেজগুলোর প্রত্যেকটিকে দেশের ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কাজেই এই রাজশাহী কলেজও ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে উঠবে।

রাজশাহী কলেজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, রাজশাহী কলেজের ১৪৭ বছরের বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। এই কলেজটিতে আসলে মুগ্ধ হবেন না এরকম লোক আমরা বোধহয় কোথাও খুঁজে পাব না। এই কলেজটি গত চার বছর যাবত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছে।

দেশের যেসকল কৃতি সন্তান রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন তাদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিতে প্রথম মিছিলটি এই রাজশাহী কলেজের ছিল। শহীদ মিনারও তৈরী হয়েছিল। সেই থেকে নিয়ে তার আগে তো ছিলই, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলসহ সকল আন্দোলন সংগ্রামে এই কলেজের অবদান অনস্বীকার্য।

তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশের এই এগিয়ে যাওয়ার গতিকে আরো ত্বরান্বিত করতে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা অবদান রাখছেন এবং রাখবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের প্রয়োজন ছিল সংখ্যার দিকে মনযোগী হওয়ার। কারন আমরা চেয়েছি সকলকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে। এখন সময় হয়েছে শিক্ষার গুনগত মানের দিকে অনেক বেশি নজর দেবার। আমাদের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে করণীয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের এই দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সফল অংশীদার হতে হলে, যদি একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, ২০৪১ রূপকল্প বাস্তবায়ন, ২০৩০ সালের এসডিজি অর্জন করতে হয়, তাহলে মানবসম্পদ উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরী।

তিনি বলেন, আমরা সবসময় বলি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা। এই শব্দটির মধ্যেই এর আসল রহস্য লুকিয়ে আছে। এখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন, তারা অনেক ভাল বুঝবেন।ডিভিডেন্ড তখনি আসে যখন তাতে বিনিয়োগ থাকে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোন অটোমেটিক বিষয় নয়, এটি আপনা-আপনি আসবে না। শিক্ষায় সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালে তার নির্বাচনী ইস্তেহারের বলেছিলেন, জিডিপির অন্তঃত পক্ষে শতকরা চারভাগ আমাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে।এখন সারা বিশ্ব বলছে অন্তত শতকরা ৬ ভাগ বিনিয়োগ করতে হবে। যদিও টাকার অঙ্কে গত দশ বছরে শিক্ষায় যে বিনিয়োগ হয়েছে তা এর আগে কোনদিন আমরা কখনো পাইনি। বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ হচ্ছে কিন্তু এ বিনিয়োগ আরো অনেক অনেক বাড়াতে হবে। এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা তা বাড়াতে বদ্ধ পরিকর। আমরা বিনিয়োগ বাড়াবো, আমরা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য যে বিষয়গুলি খুব জরুরী তা আমরা করব।

শিক্ষায় বিনিয়োগের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য যেখানে অটোমেশন দরকার তার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের তৈরী করার জন্য মানস্মমত শিক্ষক লাগবে। এজন্য আমাদের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তার জন্য বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বে সেই বিনিয়োগ আমাদের হচ্ছে।এই ক্ষেত্রগুলোতে কারিকুলাম পরিবর্তন, পরিমার্জন, উন্নততর, পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে পরিবর্তন করা হবে। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেও বলেছেন, শিক্ষার্থীদের উপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমাতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ হতে হবে আনন্দময়। অবশ্য তার জন্যে এরকম পরিবেশও দরকার। সবজায়গায় আমরা এত সুন্দর পরিবেশ কিভাবে পাব বলুন?

তারপরও শিক্ষাকে করতে হবে আনন্দময় করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যেন শিক্ষার চাপে আনন্দ তিরোহিত না হয়। কাজেই আমাদের অনেক কিছু করবার আছে। শিক্ষকদের পেছনে অনেক বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে গেলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মান সম্মত শিক্ষক এসবগুলো কাজ আমরা অবশ্যই করতে চাই। তার পাশাপাশি আমরা অবকাঠাগত উন্নয়ন করব। যেগুলো করে চলেছি।
শিক্ষাবিস্তারে বর্তমান সরকারের ব্রত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে চাই। একই সঙ্গে গবেষণা অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ। সেই গবেষণায় সরকার বিনিয়োগ করছে।

শিক্ষকদেরকে গবেষণার কাজে মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদেরএকটু সমস্যা হয়, আমরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে আছি। তার একটি অন্যতম কারন, আমাদের গবেষণা হচ্ছে না তা নয়, যে গবেষণা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ হয় কম। তার কারন আমরা ভাষার দিক থেকে অনেক দুর পিছিয়ে থাকি। ভাষার ব্যাপারে আমাদের যে দুর্বলতা রয়েছে সেটি আমাদের অনেক পিছিয়ে রাখছে। আমাদের প্রতিটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাষার দিক থেকে সহযোগিতা করবার জন্য সুবিধা আমাদের তৈরী করে দিতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এডিটরিয়াল বিভাগ থাকে। যারা গবেষকদের গবেষণাপত্রকে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশে সহযোগিতা করে। আমাদেরকেও সেরকম সেল তৈরী করে দিতে হবে। গবেষকদের শুধু বরাদ্দ দিয়ে নয়, গবেষনায় যতরকম সহযোগিতা প্রয়োজন আমরা করব। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক রকম র‌্যাংকিং আছে।

আমাদের পত্র-পত্রিকা খালি বলে পিছিয়ে থাকার কথা বলে, বাঁকিদেরগুলো বলে না। ইতিমধ্যে আমাদের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের বিভিন্ন জায়গায় ভাল অবস্থানে আছে। আমি আশা করি, বিশ্বাস করি, আগামী দিনে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরো অনেক অনেক ভাল করবে।

বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে যে সময় নষ্ট হয়েছে তা উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এতগুলো দিন স্বাধীনতার পর অধিকাংশ সময় নষ্ট করেছি। স্বৈরশাসনের যাতাকলসহ বিভিন্নভাবে নষ্ট সময় আমরা পার করেছি। সেজন্য আমরা গুনগত কোনকিছুর তরে, আমাদের মানোন্নয়নের তরে মনযোগ দিতে পারি নি। শুধু টিকে থাকবার জন্যে, গণতন্ত্রকে রক্ষা করবার জন্য সংগ্রামে আমাদের সময় কেটেছে।

দীপু মনি বলেন, আজকে যেহেতু আমাদের গণতন্ত্র আছে, সরকারের গণতন্ত্র আছে, যখন পর পর চারবার একটি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে, যে সরকারটি গণমুখী সরকার, জনকল্যাণকর সরকার, শিক্ষাবান্ধব সরকার তখন আমাদের গুনগত দিকগুলোকে আরো উন্নত করায় মনোনিবেশ করতে হবে। এই অগ্রযাত্রাকে যদি ধরে রাখতে হয় আমাদেরকে অবশ্যই সকল অপশক্তিকে রুখে দাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন থেকে অনুপস্থিত সফট স্কিলস ক্রিটিক্যাল থিংকিং,প্রবলেম সলভিং, ক্রিয়েটিভিটি, সহমর্মিতা,কোলাবোরেট করা, সহযোগিতা করেতে, টিম বিল্ডিং করতে, লিডারশিপ করতে শিখতে হবে। এই সফট স্কিলসগুলোর উপর ভিত্তি করে আগামী দিনের ও বর্তমানেরও সকল কাজ পরিচালিত হবে। সাফল্যের জন্য এগুলোই চাবিকাঠি। সেই সফটস্কিলগুলো শিক্ষার্থীদেরকে তেমনভাবে শেখাতে পারিনি। আমাদের লক্ষ্য হবে, কারিকুলামের লক্ষ্য হবে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দানের পাশাপাশি সফট স্কিলসগুলো শেখানো।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আজকে রাজশাহী কলেজের ১৪৭ বছরের ইতিাহসে যারা এইচএসসির পাশ করেছেন তাদের মিলনমেলা হচ্ছে। এরকম মিলনমেলা ২৪৭ বা ৩৪৭ বছর পরেও হবে ইনশাল্লাহ।রাজশাহী কলেজ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে, অতীতে যেমন আমাদের বহু কৃতি মানুষ তৈরী করেছে আগামী দিনেও তা অব্যাহত রাখবে। এছাড়াও তিনি দেশের উন্নয়নে প্রত্যেকের নিজ জায়গা থেকে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ ও অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান। বক্তব্য রাখার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি, নাটোর-৪ আসনের এমপি আব্দুল কুদ্দুস, রাজশাহী-৩ আসনের এমপি আয়েন উদ্দিন, সংরক্ষিত আসনের এমপি আদিবা আনজুম মিতা প্রমূখ।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালী বের করা হয়। র‌্যালীতে প্রতিটি ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। দেশের সর্বপ্রথম এইচএসসি অ্যালামনাই এবং সর্ববৃহৎ অ্যালামনাই এটি- এমন দাবি করেছেন আয়োজকরা।

প্রসঙ্গত, দুইদিনব্যাপী এই অ্যালামনাই অনুষ্ঠানে ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজের ১৯৪৭ থেকে ২০২১ সালের ব্যাচের ৯ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের গেস্টসহ মোট ১০ হাজার জন অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্যে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬০ সালের ব্যাচের ৪৩ জন নিবন্ধন করেন। ১৯৪৭ সালের একজন অ্যালামনাই ডাঃ এসএ বারী এতে অংশগ্রহণ করেছেন। যিনি সবচেয়ে বেশি পুরোনো অ্যালামনাস। অ্যালামনাই অনুষ্ঠানের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here