মলিন মুখেও হাসির ঝিলিক রিপনের!

1
551
রাজশাহী কলেজে ভর্তি হতে ইটভাটায় কাজ

একাদশে রাজশাহী কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েও অর্থাভাবে গতবছর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি রিপন হোসেন নামে এক ছাত্র। কারণ অর্থসংকটে থাকা মা তাঁর ছেলেটিকে রাজশাহীতে পড়ার সাহস নেন নি। তাই কলেজে ভর্তি হতে টানা একবছর ইটভাটায় কাজ করেছে রিপন হোসেন। রাতদিন সমান খেটে জমিয়েছিলো ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রচন্ড শীতে কাজ করতে গিয়ে হয়ে যায় টনসিল। পরে অপারেশন করতে চলে যায় ১৫ হাজার টাকা।

কিন্তু স্বপ্নে ছিলো রাজশাহী কলেজে ভর্তি। দ্বিতীয় দফা রাজশাহী কলেজে ভর্তি মনস্থির করে নেমে যায় আয়-রোজগারে। নানান চেষ্টায় একবছরেও সেই টাকা জোগাড় হয়নি রিপনের।

কিন্তু কিছুতেই হাল ছাড়েনি স্বপ্নের কলেজে ভর্তির। দ্বিতীয় দফায় ভর্তির সুযোগ পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে বন্ধু ফিরোজ আহম্মেদ ফাইনের সহায়তায় হাজির হয় কলেজে।

পেটের খাবার জোগাড় করতে ধান কেনে ৫ হাজার টাকার। অপারেশনের পর দীর্ঘ বিশ্রাম। কাজে যেতে না পেরে বাকি দশ হাজার টাকাও চলে যায় সংসার খরচায়। শেষে বন্ধুর সহায়তায় গ্রামের একটি কলেজে ভর্তিও হয় রিপন। কিন্তু বইপত্র কেনার পয়সা ছিলোনা। ফলে নিজে থেকেই বাদ দেয় কলেজে যাওয়া।

সরাসরি দেখা করে অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমানের সাথে। এরপর বদলে যায় তার জীবনের গল্প। রিপনের ভর্তির দায়িত্ব নেন স্বয়ং অধ্যক্ষ। আগামীতে সাধ্যমত তাকে সহায়তার আশ্বাসও দেন প্রফেসর হবিবুর রহমান।

অধ্যক্ষের দপ্তর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় কথা হয় রিপন হোসেনের সাথে। রোগা-পাতলা গড়ন, পরনে পুরনো চেকশার্ট ও হালকা নীল রঙের ট্রাওজার। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। মলিন মুখেও হাসির ঝিলিক। দুচোখ দিয়ে ঠিকরে বের হচ্ছে সীমাহীন আনন্দ।

কলেজের প্রশাসন ভাবনের সামনে কথা হয় রিপন হোসেনের সাথে। সে জানায়, ২০১৯ সালে মান্দার চকউলী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি পাশ করেছে সে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫। শুধু ইংরেজিতে ৫ মার্ক কম পাওয়ায় ছুটে যায় গোল্ডেন এ-প্লাস। যদিও অষ্টম শ্রেণিতে একই বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে সে।

তার গ্রামের বাড়ি উপজেলার কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের আন্দারিয়াপাড়ায়। বাবা জয়বুল হোসেন বাদশা দ্বিতীয় বিয়ে করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বাস করছেন। তার যখন বয়স তিন বছর, তখনই ছেড়ে যান বাবা।

দাদা কলিম উদ্দিন প্রামানিকের আশ্রয়ে তারা থেকে যান। বসতভিটা ছাড়া কোন সহায়-সম্পত্তি নেই তাদের। বৃদ্ধ বয়সে কাজ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। শেষে অন্যের সাহায্য-সহযোগীতায় সংসার চলতো। অষ্টম শ্রেণি পাশ মা জুলেখা খাতুন ছোটখাটো কাজ করে তাকেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিয়ে যান।

বছর দুয়েক আগে বিড়ি শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। মায়ের হাড়ভাঙা শ্রম এবং শিক্ষকদের সহায়তা শেষে এসএসসির বাধা পেরিয়ে যায় রিপন। এবছরের ৬ ফেব্রুয়ারী একমাত্র আশ্রয় দাদাকে হারান। সবমিলিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এইচএসসি। গত বছরই অনলাইন আবেদন করে রাজশাহী কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়। কলেজে এসে ভর্তির প্রাথমিক কাজও শেষ করে। কিন্তু ফি জমা দিতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। হাতে টাকা না থাকায় ভর্তি না হয়েই ফিরে যেতে হয় বাড়ি। এরপর শুরু হয় ভর্তি এবং রাজশাহীতে থাকা-খাওয়ার টাকা জোগাড়ের মিশন।

রিপন আরো জানায়, তৃতীয় শ্রণিতে পড়ার সময় ইটভাটায় তার কাজ শুরু। শুরুর দিকে কেবল ইট উল্টাতে হতো। এরপর হাত লাগায় ইট বানতে। সবমিলিয়ে টানা ছয় বছর কাজ করেছে ইটভাটায়। এই ভাটায় কাজ করেই কলেজে ভর্তির টাকা জমিয়েছিলো সে। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই টাকা চলে যায় চিকিৎসায় ও এবং সংসার খরচায়।

রাজশাহী কলেজে ভর্তির স্বপ্ন পুরণে সামনে এসে দাঁড়ায় বন্ধু ও ঢাকা আইএইচটির শিক্ষার্থী ফিরোজ আহম্মেদ ফাইন। ওই বন্ধু তার দ্বিতীয় দফায় রাজশাহী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভতির অনলাইন আবেদন করে। এবার রাজশাহী কলেজে তার বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির সুযোগ হয়েছে।

কিন্তু এবারও বাধ হয়ে দাঁড়ায় আর্থিক সমস্যা। শেষে একই উপজেলার কয়লাবাড়ির বাসিন্দা ও রাজশাহী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন মোল্লার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ হয়। ওই শিক্ষকই তাকে অধ্যক্ষের কাছে যাবার পরামর্শ দেন।

রিপনের স্বপ্ন ভালো ফলাফল করে ব্যাংকার হওয়া। এর পেছনেই একটা গল্প আছে রিপনের। এসএসসি পাশ করার পর ডাচবাংলা ব্যাংকের শিক্ষাবৃত্তির জন্য বিবেচিত হয় সে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নথিপত্রসহ বাবাকে সাথে নিয়ে হাজির হতে বলেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও বাবাকে হাজির করতে পারেনি রিপন।

শেষে ব্যাংক কর্তাদের পরামর্শে মাকে নিয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয় ব্যাংকের লোকজন। শেষে নথিপত্র জমা না নিয়েই তাদের অপদস্ত করে বের করে দেয়। সেই দিনই সে প্রতিজ্ঞা করে, বড় ব্যাংক কর্তা হয়ে মায়ের সম্মান ফিরিয়ে দেয়ার।

জানতে চাইলে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান জানান, জীবন থেকে ছেলেটি তার মূল্যবান একটি বছর হারিয়ে ফেলেছে। এবারও সাহস করে কলেজে না এলে হয়তো তার ভর্তি হওয়া হতোনা। তার দুরাবস্থার কথা শুনে তাৎক্ষনিকভাবে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামীতে তার পাশে থাকবে রাজশাহী কলেজ।

অধ্যক্ষ আরো বলেন, অর্থের অভাবে হয়তো অনেকেই এই কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেনা। সেই খবর আমাদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। সরাসরি তারা অধ্যক্ষের কাছে আসলে তারা ভর্তির সুযোগ পেতে পারে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফি ৩ হাজার টাকা, এই ফি না নিয়েও রাজশাহী চলবে।
রাজশাহী কলেজেরমত অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিত এমন শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা। এটা সবার দায়িত্ব, সমাজের দয়িত্ব। অর্থের অভাবে কেউ যেনো সমাজ ও দেশের বোঝা না হয়ে যায় সেই দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here